রম্য রচনা , অনন্যা সাহিত্য পত্রিকা, গল্প , ২০১৬, অমিয় আদক
অনন্যা সাহিত্য পত্রিকা
আজ অনন্যা সাহিত্য পত্রিকার পাতায় থাকছে
অমিয় আদকের রম্যরচনা
। অনন্যার পাতায় লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ৬৮ - ৭০ পাতায়। লেখার সঙ্গে পত্রিকায় প্রকাশিত পাতার ছবিও দেওয়া হল।কর্ণ সমাচার(রম্যরচনা)
অমিয় আদক।
রচনাটি শ্রাব্য নয়, পাঠ্য।এক্ষেত্রে কানের দরকার
নেই। এরজন্য দৃষ্টিশক্তির প্রয়োজন। অন্তর্দৃষ্টির প্রয়োজন প্রায়নেই। কান শ্রবন
ইন্দ্রিয়। আমাদের শব্দ সাম্রাজ্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটায়। যাঁদের শ্রবনশক্তি কম বা
প্রায় নেই, তাঁদেরবলি কালা। ধরেনিই, তাঁদের কানে লাগানো তালা। তাঁরা বালা
শুনতে, শোনেন শালা। যাঁরা শুনতে পেয়েও না শোনার ভান করেন।
তাঁদের বলি শেয়ানা কালা।এঁরাই বাড়ান অন্যের জ্বালা। তবে বয়স বাড়ার ফলে শেষ বয়সে
যেমন দৃষ্টিশক্তির ক্রমহ্রাসমান অবস্থা আসে, শ্রবনশক্তির ক্ষেত্রেও তাই।
প্রকৃতির এই নিয়মটা শেষ বয়সেখারাপ নয়। তারফলে
বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের খানিক সুবিধে হয়। কানে কম শোনেনঅক্ষম বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা।প্রায়ই পরিবারের
অন্য সদস্যদের থেকে তির্যক টিপ্পনীর বুলেটতাঁদের কানে ঢোকে।
কিন্তুমস্তিষ্কে ঢুকতে পারেনা, বধিরতার কারণে। তাই
মন খারাপও করতে হয়না। এছাড়া বুড়ো-বুড়িদের পরস্পরের প্রতি নিক্ষিপ্ত বক্রোক্তিগুলোও
পরস্পরের নিকটঅশ্রুতই থেকেযায়। সেগুলির কিছুকিছু শ্রুতিযোগ্য হলে, শেষ বয়সে বুড়োবুড়ির
বিষম ঝগড়া অনিবার্য্য।
আংশিক বধিরতার
কারণে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের কথোপকথন একটু উচ্চস্বরেই করতে হয়।নাহলে একজন অন্য জনকে
অবশ্যই বলবেন, “কিগো, কানের মাথা খেয়েছ নাকি? নাকি কানে তুলো ঠেসে বসেআছ?” অথবা
বলবেন, “কিগো, দশবছর আগে ফিসফিস করে বললেও শুনতে পেতে। এখন পাড়া জানিয়ে বললেও কানে
কথা ঢোকেনা? কি ব্যাপার বলতো? বুড়ো হয়েছি বলেই কি কদর কমেগেল?” অথবা বাক্যটার শেষ
অংশ ‘বুড়ি হয়েছি বলেই কি কদর কমেগেল?’ এটাও হতে পারতো। অথচ নিজেদের শ্রবণশক্তি হ্রাসের
ব্যাপারটা নিজেরাই ভুলেযান। যখন বিষয়টা পরস্পরের নিকট পরিষ্কার হয়, তখন দুজনেই
আধা-ফোকলাদাঁত বেরকরে সশব্দে হাসির ফোয়ারা ছোটান। কেউ হঠাৎ হাজির হলে দ্রুত হাসি
গোপনের চেষ্টাকরেন।
কর্ণ বিষয়ে কিছু বলব। ব্যাপারটা নিয়ে দোহাই
কানাকানি করবেন না। বিষয়টা গুজব মনেকরলে কান দেবেন না।কানতো মাথার সঙ্গে সংযুক্ত।তাই
মনেরাখবেন কান টানলে মাথা আসবেই। ব্যাপারটা ছোটবেলার কানমলা প্রাপ্তির কথা মনেকরায়।
শৈশবে ছোটখাট অপরাধ করে বড়দের কাছথেকে কতমিস্টি কানমলা উপহার পেয়েছি। লঘুশাস্তির
কানমলা মন্দ নয়। কিন্তু গুরুশাস্তির কানমলা কানের পাতায় বিস্তর ব্যাথা ধরায়। সে
রকম দু’একটা বেদনাময় স্মৃতি এখনো স্মৃতিভাণ্ডারেআছে। মনে পড়লে কান ভোঁভোঁ করে। আর
যাঁরা শাস্তি দিয়েছিলেন, তাঁদের প্রতি রাগে কান গরম হয়েওঠে।
আর গোপনকথা, সেতো
কানেকানেই বলতে হয়।নাহলে গোপনীয়তা কিসের? এরজন্য ফিসফিসিয়ে কথাবলা প্র্যাকটিস্
করা একান্তই দরকার। নাহলেই গেল, গোপন কথার বেলুন ফুস।তবে
কানেকানে কথায় কখনও আবার কানভাঙানিও দেওয়া যায়। আমি নিঃশব্দে লিখেছি। তাই আপনাদের
কান ভাঙাচ্ছি, এমনটাভাববেন না। চোখ কান খোলারাখুন। দেখুন এখানে আমি কেবল কানের কথাই
লিখেছি। আর যাঁরা কানের মাথা খেয়েছেন, তাঁদের এই রচনা নিয়ে কোন
অসুবিধাই নেই। কারণ তাঁরা কানের কথা চোখদিয়েই শুনছেন। তবে আমার এই কথাগুলো কানের
কাছে কানাইএর বাসার মত বিরক্তিকর মনে করলেও আমার আপত্তি নেই।
আমিএকান্ত প্রিয়জনের মতমাথার দিব্যিদিয়ে, কান
কামড়েবলছি না। আমার কথা কানে না নিলেও চলবে।তা এক কানদিয়ে ঢোকাবেন অন্যটা দিয়ে ড্রেনপথে নোংরা জলের মত বেরকরে
দেবেন। বিছানায় একপাশে শায়িত অবস্থায় থাকলে একটা কান বালিশে
চাপা। অন্যটি উপরে। তাহলে ছোট কথাআপনার কানে ঢুকলেও বেরোবেনা। অভিজ্ঞতাটা মনে
করিয়ে দিই। বিছানায় ওইভাবে শায়িত অবস্থায় আপনার প্রিয়তমা লিঙ্গান্তরে প্রিয়তম যা
বলতেন, তা কান থেকে অন্তরেপ্রবিষ্টহোত। ইচ্ছাকরে ভুলতে চাইলেও, পারতেন না।ওই কথার
মান্যতা না দিলে, আপনিও নাকমলা কানমলা দিতে বাধ্য থাকতেন।
কানের দিব্যিদিয়ে বলতে পারি। কারণ পৈতেটাতো ওই কানেই রাখতে হয়।
বিশেষ কাজের সময়ে।
কান আছে এমন কানকাটাদের দেখে বড্ড করুণা হয়।
কানকাটা না হওয়ার চেষ্টাই করবেন। লজ্জ্বা নারীর ভূষণ বলে, পুরুষেরা লজ্জ্বাহীন
হবেন এটা ঠিকনয়। পরামর্শটা কেবল পুরুষ পাঠকদের জন্যই।
ঘন্টাকর্ণদেবের দুকানের দুটি ঘন্টা কেবল অলঙ্কার নয়। ঘন্টাদুটি ঘন্টাকর্ণদেবের
বিশেষ কৌশল।ছোট ভক্তদের ছোট আবদারগুলো ঘন্টার শব্দ পারহয়ে কানে
অপ্রবেশ্য করার ব্যাবস্থা। কেবল বড় ভক্তদের বড় এবং জোরদার আবদারগুলো ঘন্টার শব্দকে অতিক্রম করে কানে
ঢোকানোর ব্যবস্থা। তাই সংসারের অভাবের ঘ্যানঘ্যানানি, রাজনীতির শ্লোগান, গিন্নীর প্যানপ্যানানি
ইত্যাদিকানে নাতোলার জন্য পুরুষদের ঘন্টাকর্ণ হওয়াই ভালো। তাতে শব্দদূষণ ঘটে ঘটুক। কান
বধির হয় হোক। জয়বাবা ঘন্টাকর্ণের জয়।
যাঁরা কানে কম শোনেন,
তাঁরা শ্রবন সহায়ক যন্ত্র লাগান। তাহলে অন্তত কিছু টিপ্পনী থেকেরেহাই পাবেন। যেমন, ‘উনি কানে খাটো’ ‘উনি ছোট কথায় কান
দেননা’ ইত্যাদি। আর যাঁরা কানে ঠিকঠাক শুনতে পান, তাঁদের বলি। এমন যন্ত্র উদ্ভাবন
করুন যাতে অতি প্রাবল্যের শব্দ, কম প্রাবল্যের শব্দ হিসাবে কানে ঢোকে। নচেৎ বধির
হতে দেরি হবেনা। আজকের দিনে মাইক কতটা অমায়িক, নিশ্চয়টের পাচ্ছেন। কান ঝালাপালা। যেন
কানের পর্দাটা এক্ষুনি ফেটেগেল।হৃদস্পন্দনকেও গোলমাল করে দিল। বুঝি হার্টফেল করলেন।
চিৎপাত দিয়ে অজ্ঞান হতে আর বাকি নেই।
বর্তমানে মানুষের কানে সুপরামর্শ ঢোকে না। তবুও
বলছি। গোপনকথা শোনার জন্য কানখাড়া রাখবেন না। তবে
সৎ ব্যক্তির পরামর্শ অবশ্যই কানে নেবেন। এর কথা ওকে বলে কানভারি করবেন না। কানেকানে কথা বলার প্রয়োজন
থাকে বলবেন। তা যেন কানাঘুষোয় পরিণত না হয়। ভাল গান, ভাল কথা,
সুমিষ্ট শব্দরাজি নিশ্চয়ই প্রাণভরে শুনবেন। গুজবগুলোকে কানে তুলবেন না। কিছু
কানপাতলা লোক আছে। তারা
পেটপাতলার মত একের কথা অন্যের কানে পাচার করবেই।
মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের উদ্দেশ্যে বলছি।
গণসংযোগ মাধ্যমেরসুবিধা নিতেগিয়ে কানের বিপদ ডাকবেন না। বারংবার ফোনটি কানের পাতায়
চাপলে অনেক বেশি প্রাবল্যের শব্দ কানে প্রবিষ্টহয়। আর বধিরতাকে নিমন্ত্রণ করাহয়।
হেডফোনে সঙ্গীতের মাধুর্য্য উপভোক্তাদের জন্যও সমপর্যায়ের বিপদ অপেক্ষমাণ।
বেশি গান শুনে কানের মাথা খাবেন না।
ভাইঝি প্রশ্ন
করল, “আচ্ছা কাকু, এমন কি বিষয়বস্তু আছে, দুটো কর্ন থাকা সত্বেও শুনতে পায়না?” আমার উত্তর, “বধির ব্যক্তি।”ভাইঝি বলে, “ধূর,
উত্তরটা হবে- চতুর্ভুজ।” উত্তরটা শুনে নিজেই লজ্জ্বা পেলাম। সত্যিইতো চতুর্ভুজের
কর্ন আছে,তা শ্রবন ইন্দ্রিয় নয়। মহাভারতের বিখ্যাত চরিত্র কর্ণেরওকর্ণ ছিল। ছিল সহজাত
ভূষণ কবচ, কুণ্ডল। হিন্দুদের দশবিধ সংস্কারের একটি ছিল কর্ণবেধ।
এককালে নারীপুরুষ নির্বিশেষে কর্ণভূষণ ব্যবহার করত। তাই হয়ত ওই যুগে কর্ণজপ বা
কুমন্ত্রণার ব্যাপারটি কম ঘটত। তবে কর্ণাকর্ণি নিশ্চয়ই হত। আর ভালো বিষয়বস্তুর কর্ণান্তরের ঘটনা অবশ্যই ঘটত। কারণ বেদের মত
মহাবিদ্যার আর একনাম শ্রুতি।
কান বিষয়ে কথা ভাল না লাগলে, কর্ণগত করবেন না।
কর্ণরন্ধ্র কিছুদিয়ে আবদ্ধ রাখুন। কর্ণমলে আবদ্ধ থাকলে পরিষ্কার করাবেন অবশ্যই। নচেৎ শ্রবন ইন্দ্রিয় ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
সত্যিকারের কাজের সময়কারা বধির হয়েযান? উত্তরটা হল-ভোটে নির্বাচিত যেকোন পর্যায়ের
জনপ্রতিনিধি। রাজনীতির ধ্বজাধারী দাদা-দিদিরা এবার আমার উপর ক্ষেপে যাবেন। শেষে
কানটাই ধরে ফেলবেন। ওই দাদা-দিদিদের বলব, “আমার উত্তরটা বাতিল না করে, একটু
ঠান্ডামাথায় ভাবুন। কারণ নির্বাচনের আগে আপনাদের শ্রীবদনে প্রতিশ্রুতির বন্যাছোটে। যাকে
আটকানোর মত বিশাল প্রতিশ্রুতির আধার নেই।অথচ নির্বাচনের পর আপনারা সবটাই ভুলে যান।
তখন জনগনের সমস্যা সমাধানে আপনারা নেহাত বোবা এবং বধির। জনগণ বিষয়টা স্মরণ করালে,
আপনারা উত্তেজিত হন। আপনাদের কান উত্তপ্ত, রক্তবর্ণ হয়।”
দাদা-দিদিরা
দুনিয়ায় ভালোমন্দ সব ব্যাপারেই কানখোলা রাখুন। শুধু একটা বিষয়ে কানদুটিকে
লকআউট করুন। উত্তর প্রজন্মের কানগুলোকেও
বন্ধকরুন। শব্দদানবের
অত্যাচার এবং রাজনীতির মহামহিমদের অশ্রাব্য রুচিহীন মন্তব্যগুলোকে
আটকান।নাহলে ওদের ইহকাল ফর্সা। ওরাও রুচি বর্জিত সমাজের অংশীদার হবে।



No comments