Header Ads

Header ADS

অনন্যা সাহিত্য পত্রিকা, 2016, বলাকা সেন, Story,

Ananya Sahitya Patrika
Ananya Sahitya Patrika

                                   অনন্যা সাহিত্য পত্রিকা



                                                   আজ অনন্যা সাহিত্য পত্রিকার পাতায় থাকছে
বলাকা সেন 'এর  রম্যরচনা
।  অনন্যার পাতায় লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ৬৫ , ৬৬ ও ৬৭ পাতায়। লেখার সঙ্গে পত্রিকায় প্রকাশিত পাতার  ছবিও দেওয়া হল।


                                       কালুয়া কেলেঙ্কারি


                                           বলাকা সেন   





        আমরা অনেকেই কুকুর ভক্ত। মানে রাস্তা ঘাটে কুকুরদের দেখে আমাদের কষ্ট হয়। আমরা এই নিরীহ পশু কে দেখে বলে থাকি ‘আহারে! কুকুরটার কি চেহারা হয়েছে ,কেউ খেতে দেয় না মনে হয়’। এই ভেবে অনেকে দুপুরের উচ্ছিষ্ট খাদ্য ডেকে এনে পাত পেড়ে কুকুর কে খাওয়ায়। বেশির ভাগ মানুষের আবার বিলেতি কুকুরের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা মায়া সব বেশী। রাস্তার লেলি দেখলেই নাক সিটকায় আর নিজের বিলেতি পোষ্য কে বুকে ধরে সন্তানের মত করে মুখে মুখ দিয়ে সেই কি আদরের ঘটা, ‘আমার চুনু মুনু, নটি বয় !’ ইত্যাদি ইত্যাদি। ততক্ষণে আদুরে নটি বয়, প্রভুভক্ত হয়ে নিজের পছন্দের চ্যাটচ্যাটে লালা দিয়ে সারা মুখে ন্যাচারাল রঙের পেইন্ট করে দেয়। কত বিশিষ্ট ব্যক্তি যারা সমাজের মুখ বলে পরিচিত, তাঁরা আবার কুকুরের পায়ের উপর দিয়ে গাড়ি চলে যাওয়ার জন্য ২৪ ঘণ্টা অনশনেও বসে পড়েন অনেক সময়। আমি বলছি না কুকুরের প্রতি ভালোবাসা যত্ন অন্যায়। এই সবই খুব ভালো কেননা মানুষ তাদের একটা বিশেষ সময় কুকুরের মত জীবন যাপন করে। কেউ একজন বলেছিলেন মানুষ সৃষ্টির সময় ঈশ্বর সকল কে ৩০বছর করে বয়স দিয়েছিলেন। গাধা আর কুকুর নিজেদের জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। গাধা নিজের কাহিল অক্লান্ত পরিশ্রম নিয়ে অসুখী ছিলেন। এদিকে কুকুর সারারাত জেগে পাহারা দেওয়া, প্রভুর দাক্ষিণ্যে বেঁচে থাকা এইসব নিয়ে মনমরা হয়েছিলেন। তাই দু’জনে মিলে ঈশ্বর কে ১৫ বছরের আয়ু কমিয়ে দিতে বলেন। এদিকে মানুষ ৩০ বছরের জীবন নিয়ে মোটেও খুশি ছিলেন না। মানুষ ঈশ্বরের কাছ গিয়ে গাধা আর কুকুরের অতিরিক্ত জীবন ভিক্ষা চেয়ে বসে। ভগবান বারে বারে মানুষ কে জিজ্ঞাসা করে এতে কোনও আপত্তি আছে কিনা। মানুষ সহমত জানায়। সেই থেকে মানুষ  প্রথম ৩০ বছর নির্ঝঞ্ঝাট অতিবাহিত করে। আর মাঝের বছর গুলো গাধার মত জীবন আর শেষের জীবন কুকুরের মত অতিবাহিত করে। শেষ জীবন সারা রাত বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে কুকুরের মত রাত জেগে থাকা, কোনও কোথায় বিরক্ত হয়ে খ্যাঁট খ্যাঁট করা আর পরের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া, এই কুকুরের চরিত্র মানুষের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। এতো কিছু বলার প্রধান কারণ আমার গল্পের প্রধান হিরো বা নায়ক একটা কুকুর। কুকুর যেমন রাত জেগে পাহারা দিয়ে সারা পাড়ার মানুষ কে ঘুমাতে দেয় আবার তেমন গোটা পাড়া মাথায় তুলে নিজেও ঘুমাতে সিদ্ধহস্ত।  



         একদিন রাতের গলিতে এক জোড়া কপোত কপোতী গুটুর গুটুর করে পালতোলা নৌকোর জলে নিজেদের ভাসিয়ে দেওয়ার কথাতে মশগুল। এমন সময় অনেকক্ষণ থেকে গা চুলকে হাঁপিয়ে যাওয়া কুকুরটা, যেটা মাইতি ডাক্তারের বিলেতি স্পীচ টাকে লাইন মারার চেষ্টায় আছে...সেই শুটকো কালো কুকুর কালুয়া ঘেউ ঘেউ করে পাড়াময় কে জাগিয়ে প্রেমিক প্রেমিকার খবরটা দেওয়ার জন্য উঠে পরে লাগলো। যেনও ব্যাপারটা এরকম ‘আমই পাইনি... ও কেন পাবে?’ মেয়ে কবুতর তো ভয় পাখা ঝাপটায়। কিন্তু কুকুরের মায়া মমতা কিচ্ছুটি নেই। তাড়াতাড়ি লেজে পা পড়ার মত করে চিল্লাতে চিল্লাতে জোড়া দুটো কে তাড়া করে। এদিকে এই পাড়ায় প্রেমিকাটির এক্স প্রেমিক থাকে। সারাদিন ক্লাবে বসে তাস পেটায় আর দুঃখের এ্যাস্ট্রে তে একাকীত্বের ছাই ফেলে। ক্লাবের ছেলেগুলো তো একেকটা তেঁতুল আর করমচার কম্বিনেশন। ধরে ফেললে প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিনের থেকেও বেশী। ছোকরা তাঁর ভ্যালেন্টাইন কে নিয়ে দৌড় দৌড়। গলি থেকে বেরোনোর মুখে বিহারী নিখিলের ফলের দোকান, নিখিল কলা খেয়ে কলার খোসা ভীষণ লুডুর ছক্কার মত ছুঁড়ে দেয়। ছোকরা একটা খোসার স্লিপে সোজা এক সমান্তরালে ছিটকে গিয়ে পড়লও সামনের হাই তোলা নর্দমা মুখে। শব্দ পেয়ে কিছু ছেলেরা জানালার বাইরে উঁকি মারতেই প্রেমিকা এক্স প্রেমিকের ভয়ে প্রেসেন্ট প্রেমিকের জামায় লাগা নর্দমার কাঁদা নিয়ে নিজের মুখে অনায়াসে মেখে নেয়। ক্লাবের ছেলেগুলো আওয়াজ পেয়ে দৌড়ে এসে দেখে কাঁদা মাখা জুটি। তাদের মধ্যে এক্স প্রেমিক টি দীর্ঘদিনের অভ্যাসবশত নিজের এক্স প্রেমিকা কে চিনতে পেয়ে বলেই ফেলে, ‘কাঁদা তো প্রথম থেকেই মেখেছিলি এখন আবার নতুন করে কেন?’ শুনেই কাঁদা মাখা মেয়েটি সহ্য করতে পারে না। কি করেই বা পারে বলুন, এক তো সর্বগায়ে নিজেই লুকানোর জন্য দুর্গন্ধযুক্ত কাঁদা মেখেছে আবার উল্টে ধরাও পরে গেছে। এদিকে চিনতে পাড়ার দরুন সব হিস্ট্রি জিওগ্রাফীর রিভিশন শুরু হয়ে যায়। এক্স প্রেমিকটি মাতাল তার উপর নতুন বান্দার সাথে দেখে আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না। এন্ড্রয়েড ফোন থেকে শুরু করে শেষ কবে লাল রঙের লউঞ্জারি কিনে দিয়েছিলেন, সেই একের পর এক কাঁদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়ে গেল। প্রেমিকাও তখন ডান হাতে মুখের কাঁদা কিছুটা আলতো সরিয়ে ছেলেটির মুখে ছুড়ে দিয়ে রণক্ষেত্রে নেমে পড়লেন। ব্যাস! কোথায় ট্যাক্সিতে গিয়ে পেমেন্ট করতে গিয়ে হাত পেতে ভিক্ষা নিতে হয়েছিল, কোন সুপারমার্কেটে লেহেঙ্গা কিনে দিতে পারে নি, কবে সুশীলার ফোনে এডাল্ট জোকস পাঠিয়েছিলো, বোনের গালে হামি খেয়েছিল, পার্কে ক’বার জোর করে; মরজিমতো হোটেলে। কেচ্ছায় কেচ্ছায় কানে আঙুল দিয়ে ক্লাবের ভদ্র সদস্য ছেলেরা নিশ্চুপ। এদিকে নতুন প্রেমিকটি চোখ গোল গোল করে মাথা চুলকাতে লাগলো। এত কিছুর পেছনে যে মাতব্বরের হাত মানে আমাদের এই কাহিনীর প্রধান হিরো কালুয়া, সে একটু দূরে বসে ডিজিটাল প্রসেসের ক্লিন পিকচার ওয়ালা কোন মুভি দেখার মত মুখ করে পশ্চাতের লেজ নেড়ে যাচ্ছেন।

         বেশ কিছুক্ষণ ক্যাচরা চলার পরে পাড়ার মা মাসিরা যথার্থ স্থানে পৌঁছাবে না এটা হতেই পারে না। এর মধ্যে পাড়া ঘুরানি শুভ্রা মাসিমা সবার থেকে দশ পা এগিয়ে। এসেই বললেন ‘এই যে বাপু মোড়ের লাইট টা নিভিয়ে রাখো এ হচ্ছে তোমাদের ভুল। আর কি বলবে বল, আমাদের মেয়েগুলো কি কম যায় নাকি। এইসব ছেলে ছোকরা কে নিয়ে এসে এই ঠেক চিনিয়ে দেয়। ব্যাস! মরতে মরণ সব এখানে ফষ্টিনষ্টি করতে চলে আসে’। এই শুনে আবার শুভ্রা মাসিমার আজীবন শত্রু রুমেলা কাকিমার গায়ে ফোস্কা পড়ল। আসলে চোরের মন বোচকার দিকে। রুমেলা কাকিমার মেয়ে বয়ফ্রেন্ড চড়াতে সিলভার জুব্লি করেছে। উনি বলে উঠলেন ‘মেয়েদের দোষ দিয়ে লাভ কি বাপু। ছেলেরাই কি কম নাকি, এইতো দুদিন আগে একজন কোন পাড়ায় মেয়ের হাত ধরতে গিয়ে মার খেয়ে এলো না?’। ইঙ্গিতটা যে শুভ্রা কাকিমার ছেলের দিকে ছিল সেইটা বুঝতে কারোর অসুবিধা হওয়ার কোন যায়গা নেই। ছেলের ভক্ত শুভ্রা মাসিমা নিজের ছেলে লম্পট হোক মাতাল হোক জুয়া খেলুক তবুও সোনার আংটি। শুভ্রা কাকিমা ঝাঁপিয়ে পড়লেন রুমেলা কাকিমার দিকে ‘আমার ছেলের কথা আমায় ঘুরিয়ে বলছিস! আজ তোর একদিন কি আমার একদিন!’ একটু বাদেই দু’জন কে রাস্তায় একে অন্যের শাড়ি আর চুল ধরে টানতে দেখা যায়। চুলোচুলির চেঁচামেচি তে বাকি জনসাধারণের চোখেও হাত ঢেকে রাখার অবস্থা। সিচুয়েশান সামাল দেওয়ার জন্য পাড়ার চা বিক্রেতা বাপি কাছে গিয়ে দুজনকে থামাতে গেলে, বাপির বউ ঝিমলি বাপির চুলের মুটি ধরে বলে ‘এখানে কেন ঢুকতে যাচ্ছিস মেয়েদের মধ্যে গা ঘষাঘষি করতে খুব ইচ্ছে করে না? চল আজকে বাড়িতে! তোর থোতা মুখ যদি ভোঁতা না করে দিতে পারি তো আমার নাম না’।

কিছুতেই কিছু হচ্ছে না পাশের পাড়া থেকে বিধায়ক সীমন্তিনী বিশ্বাস ছুটে এলেন। তখন শুভ্রা মাসিমা বিজয়ের পতাকা হিসাবে রুমেলা কাকিমার শাড়ি ছিঁড়ে কিছুটা নিয়ে নিয়েছেন। হয়তো ওদের চিলেকোঠা ছাদের ত্রিশূলে লাগিয়ে রাখবেন। সীমন্তিনী দেবী সামনে এসে দাঁড়ানোতে গণ্ডগোল থেমে যায়। রুমেলা কাকিমা শুভ্রা কাকিমার মাথা থেকে ছিঁড়ে ফেলা চুল গুলো মাটিতে ফেলে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সমস্ত ঘটনা শুনতে চাইলে ক্লাবের ছেলেরা প্রথম থেকে বলতে গিয়ে কাঁদা মাখা ছেলে মেয়েটি কে দেখালেই সীমন্তিনী ইতস্তত বোধ করেন। বোঝা যায় মেয়েটি আর কারোর নয় সীমন্তিনী দেবীর নিজের একমাত্র আদরের মেয়ে। কিছু বুঝে উঠতে না পেড়ে বেগতিক দেখে সীমন্তিনী দেবী মায়ের হাত ধরে হিরহির করে টানতে টানতে নিয়ে চলে যান। কানাফুসো শুরু হয়ে যায় ‘ছিঃ ছিঃ কি সব কাণ্ড। এইরকম মায়ের এইরকমই মেয়ে হয়’। এই গণ্ডগোলের মাঝে নাটের গুরু মুল পাণ্ডা কালুয়া বাপির চায়ের দোকান থেকে একটা আস্ত পাউরুটি ঝেঁপে কামড় দিয়ে দিয়ে নিজের রাতের ডিনার সারছে। এরপর শিবাজীর সেলুনের বাইরের চাতালে রাতের ঘুম সারবে। একেই বলে কালুয়ার কেলেঙ্কারি।      









                       অনন্যা সাহিত্য পত্রিকা

No comments

Theme images by Roofoo. Powered by Blogger.